জেলা জজদের প্রতি প্রধান বিচারপতি- ‘তোলা নেয়া জজদের নাম আমার কাছে আছে। ভোগের পরিবর্তে ত্যাগের মানসিকতা সৃষ্টি করুন’

জেলা জজদের প্রতি অভিযোগ করে প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বলেছেন, আপনাদের অনেকেই নাজিরদের সঙ্গে অর্থ (টাকা পয়সা) লেনদেন করেন। তাদের কাছ থেকে তোলা নেন বলেও আমার ক াছে তথ্য রয়েছে। নাজিরদের কাছ থেকে আর তোলা নেবেন না। তিনি বলেন, আপনারা সবাই যে তোলা নেন তা নয়, কেউ কেউ নেন। তাদের নামও আমার কাছে আছে। আপনারা এই কাজটি আর করবেন না।

গতকাল শুক্রবার বিচার বিভাগীয় সম্মেলনের সমাপনী দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে সম্মেলন অনুষ্ঠানে জেলা জজদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনার নাজির সাহেব তো আরেক সম্রাট। আমার কাছে অভিযোগ রয়েছে যে আপনারা অনেকেই বদলি হওয়ার সময় দাবি (ডিমান্ড) করেন তোমরা আমাকে যেহেতু একটা কিছু দিবে সেহেতু কোরআন শরীফ আর একটি লাঠি না দিয়ে ডিপ ফ্রিজ দিও। আমার কাছে তথ্য রয়েছে। কে চেয়েছে সেটাও আমি বলতে পারি। আমি অত্যন্ত সোজা সাপটা কথা বলতে পছন্দ করি। আপনারা (জেলা জজ) নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের সঙ্গে আপনার ভালো মন্দ শেয়ার করবেন না।’

প্রধান বিচারপতি বিচারকদের উদ্দেশে বলেন, সমাজের বিভিন্ন পর্যায় থেকে আপনারা এসেছেন। কারুকার্য খচিত চেয়ারে আপনারা বসেন। আপনি আপনার সৃষ্টিকর্তার প্রতিভূ। যখন বিচারকাজ পরিচালনা করবেন আপনার সামনে থাকবে আইন এবং বিবেক। এটা থেকে পালাতে পারবেন না। মনে রাখবেন মহান আলস্নাহর দৃষ্টিশক্তির বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, দেশের ১৬ কোটি জনগণ বিচারকদের নিয়োগ দিলেও তারা বিচারকদের কর্মকাণ্ড ও সততা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। এটা সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন পর্যন্ত। বিচার বিভাগ এখন জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে।

তিনি বিচারকদের উদ্দেশে আরো বলেন, ভোগের পরিবর্তে ত্যাগের মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে। এ জীবনে নাইবা হলো একটি বড় ফ্ল্যাট বা বাড়ি, নাইবা হলো একটি বড় গাড়ি। তিনি বিচারকদের মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘একটি ন্যায় বিচার করলে সাত আকবরি হজ্বের সওয়াব পাওয়া যায়। ইসলাম ও হাদিস বলছে এ সুসংবাদতো শুধু বিচারকদের জন্যেই। অন্য কারও জন্যেতো এ সুসংবাদ নেই।’

নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালতে মামলার রেকর্ড আসতে বিলম্বের কারণ উলেস্নখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, রেকর্ড না যাওয়ার জন্যও তদবির করা হয়। আজ আমি বলছি, কাল রাস্তার লোক বলবে। তার থেকে আমি বলাই ভালো।

এজলাসে বসে বিচারকরা আদেশ দিচ্ছেন কি না তার দিকে খেয়াল রাখার জন্য জেলা জজদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, নিজে কাজ করবেন। অন্যদেরও কাজ করতে উৎসাহিত করবেন। তাহলে যানজটের মতো সৃষ্ট মামলাজটও কমে যাবে। একজন বিচারক মামলা শুরু করেন, সাত নম্বর জজ এসে বিচার শেষ করেন। ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব আপনাদের। মামলাজট নিরসনের ব্যাপারে প্রধান বিচারপতি বলেন, কোন আদালতে মামলা বেশি থাকলে ট্রান্সফার করে দিবেন। ফ্যামেলি কোর্টে অনেক মামলা পড়ে আছে। অনেক বিচারক পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে কর্মস্থল থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকায় চলে আসেন। আবার রবিবার গিয়ে অফিস করেন। ফলে বিচারকরা কর্মস্থলে পুরো মনোযোগ দিতে পারেন না। আপনারা কেন পরিবার সঙ্গে রাখবেন না? নিজেদের পরিবার সঙ্গে রাখবেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, আমার বাবা একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তাকে অনেক জায়গায় বদলি হতে হয়েছে। আমাকে পাঁচবার স্কুল পরিবর্তন করতে হয়েছে। আমি কি এতদূর আসতে পারিনি? আলস্নাহতায়ালার মেহেরবানীতে এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি। তিনি বলেন, চাকরি নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনারা আপনাদের পুরো সময় জনগণের কাছে বিক্রি করেছেন। আমি ১৯৯৮ সালে যখন বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলাম তখন বেতন পেতাম ১২ হাজার টাকা। এর বিনিময়ে আমার পুরো সময় আমি জনগণের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলাম। তিনি বলেন, সকাল ৯টায় ফোন করে অনেক জেলা জজকে পাওয়া যায় না। হয় আপনার ফোনে ব্যস্ত থাকে না হয় আপনাদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা ফোন ব্যস্ত রাখে। ঢাকার অধস্তন আদালত পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বিনিময় করে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি খুবই সাধারণভাবে নিম্ন আদালতে যাই। সেখানে গিয়ে দেখতে পাই যে, বেলা সাড়ে ১২টার মধ্যে এজলাস থেকে অনেক বিচারক নেমে গেছে। আবার অনেক বিচারকের পোশাকও ঠিক ছিলো না। প্রধান বিচারপতি বলেন, জামিন মৌলিক অধিকার নয়। তবে কাউকে অন্যায়ভাবে আটক রেখে স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করারও সুযোগ নেই।

সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে সারাদেশ থেকে ১৫৪ জন জেলা ও দায়রা জজ যোগ দেন। সম্মেলনে বিচারকরা তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা প্রধান বিচারপতির কাছে তুলে ধরেন। প্রধান বিচারপতি তাদের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক প্রধান বিচারপতি হিসাবে দায়িত্ব নেয়ার পর এ ধরনের বিচার বিভাগীয় সম্মেলন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। এর অংশ হিসাবে গত ২২ অক্টোবর প্রথম বিচার বিভাগীয় সম্মেলনের প্রথম পর্বে সহকারী জজদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে অধঃস্তন আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধান বিচারপতি। এতে প্রায় দেড় হাজার বিচারক অংশ নেন। গতকাল জেলা জজদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলো এ সম্মেলনের। অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের রেজিষ্ট্রার মো. আশরাফুল ইসলামসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সবের্াচ্চ থেকে সর্বনিম্ন পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ

এদিকে বৃহস্পতিবার রাতে প্রধান বিচারপতি সহকারী জজ ও বিচারিক হাকিমদের উদ্দেশে বলেছেন, বিচার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন পর্যায় আজ প্রশ্নবিদ্ধ। উচ্চ ও নিম্ন কোনো আদালত সম্পর্কেই মানুষের ধারণা ভাল নয়। তিনি বিচারকদের উদ্দেশে বলেন, আইন মেনে চলবেন। কে কী বলল, চিন্তা করবেন না। বিবেক অনুসারে বিচারকাজ করবেন। স্বচ্ছতা বজায় রেখে প্রকাশ্য আদালতে রায় ও আদেশ দিতে হবে। বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত নতুন নিয়োগ পাওয়া সহকারী জজ ও বিচারিক হাকিমদের ১০১তম বিচার প্রশাসন মৌলিক প্রশিক্ষণ কোর্সের সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে তৈরি। এই সংবিধান লংঘনের ক্ষমতা কারো নেই। যত উচ্চ পদে যে আসীন থাকুন না কেন সংবিধান মানতে সবাই বাধ্য। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি সবাই সংবিধান মানতে বাধ্য। তিনি বলেন, আমরা কখনো সংবিধান ভঙ্গ করব না। সংবিধান সামান্য সামান্য করে ভঙ্গ করতে থাকলে এর কোনো অবশিষ্ট থাকবে না।

তিনি বলেন, আমরা সবাই জনগণের সেবক। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি সবাই জনগণের সেবক। যে যত উচ্চ পদে সে জনগণের তত বড় সেবক। অনুষ্ঠানে নতুন নিয়োগ পাওয়া ৩৭ জন সহকারী জজ ও বিচারিক হাকিমকে বিচার প্রশাসন মৌলিক প্রশিক্ষণ কোর্সের সনদ প্রদান করেন প্রধান বিচারপতি। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক বিচারপতি মোঃ হামিদুল হক ও সহকারী জজ হুমায়-ন কবির।

Src: http://ittefaq.com.bd/content/2010/11/13/news0973.htm
Share

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.