“অমুক মাছ কেটে দিনে দশ হাজার কামাচ্ছে”- এসব গল্প এখন অনেকেই শোনায় Rumi, November 22, 2025February 7, 2026 “অমুক মাছ কেটে দিনে দশ হাজার কামাচ্ছে” “লাউয়ের বাগান করে কোটিপতি” “চাকরি ছেড়ে গোবর আর কেচো নাড়াচাড়া” এসব গল্প এখন অনেকেই শোনায়। তরুণদের জন্য, এই ফাঁদে পড়বেন না। একদম নিজের চোখে দেখা অভিজ্ঞতা। আমাদের বয়সী একজন, ওয়েল পেইড জব ছেড়ে এইসব কুইক ক্যাশের নেশায় পড়ে গেলো। এখন হাউমাউ করে মরছে। ১। আপনি যা-ই করেন, সেটার এক্সপান্ডিবিলিটি থাকতে হবে। ধরুন, একজন রিকশাওয়ালা, সে ডিসেন্ট আয় করে, এন্ট্রি লেভেল চাকরিজীবীর চেয়ে বেশী। রিকশাওয়ালা ৩০ হাজার কামায় আর জবে নতুন হলে ১৫ হাজার বেতন – সবাই আপনাকে এটুকুই বলবে। এবার পরের হিসাবটা, ধরুন ওই রিকশাওয়ালা তার ইনকাম ডাবল করতে চায়, বা ইভেন বাড়াতে চায়। তার জন্য একমাত্র অপশন রিকশা চালানোর সময় বাড়িয়ে দেওয়া। ডাবল করতে চাইলে তাকে ১০ ঘন্টার জায়গায় ২০ ঘণ্টা রিকশা চালাতে হবে। এটা কী ফিজিকালি পসিবল? সাথে বৃষ্টি, রোদ, ছুটির দিনে কাজে না গেলে আয় নেই। বা যে মাছ কাটছে তাকে ডাবল মাছ কাটতে হবে। কিন্তু এন্ট্রি লেভেলের জবে ৪/৫ বছরে বেতন ডাবল হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক, কোনো অতিরিক্ত ঘন্টা না বাড়িয়েই। ২। আপনি যে কাজটা করতে চান সেটা তো ভালো লাগতে হবে। ফেসবুকের এক লাইকখোরের লেখা পড়ে আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন বাজারে বসে মাছ কাটবেন, চাকরীর ডাবল ইনকাম। ভেবে দেখুন, আগামী ত্রিশ বছর আপনি বটি ঘাড়ে করে মাছবাজারে গিয়ে নোংরা জলের মধ্যে বসে মাছ নাড়াচাড়া করতে রাজি আছেন কিনা। ৩। লাইফস্টাইলের ব্যপার রয়েছে। আপনার যখন তেমন ইনকাম ছিলো না আপনি বাইক চালাতেন। সামনে টাকা হবে, গাড়ী কিনবেন। কিন্তু এসব কাজে তার কাজ কী? গাড়ী চালিয়ে কি আপনি ঝালমুড়ি বেচতে যাবেন? ৪। চাকরিজীবি বা ডিসেন্ট লেভেলের উদ্যোক্তা হলে আপনি তার সাথে একটা লাইফস্টাইল আর নেটওয়ার্ক বাই ডিফল্ট পাবেন। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ধরুণ, আপনি একটা স্টেশনারি কোম্পানির মার্কেটিংয়ে জব করেন। আপনি আজ এই ভার্সিটিতে, কাল ওই ঝকঝকে অফিসে বিটুবি ডিল করতে যাবেন। কত হাই স্কিল লোকের সাথে পরিচিতি হবে, কন্টাক্ট বিনিময় হবে। কিন্তু আপনি টাকা দেখে রাস্তায় ঝুড়ি নিয়ে দাড়ালেন। আপনার নেটওয়ার্ক হবে পাশের বাদামওয়ালা, গান গাওয়া ভিক্ষুক। ওই বাদামওয়ালার এই মুহুর্তের সবচেয়ে বড় চিন্তা সে কতক্ষণে সব বিক্রি করে ঘরে যাবে। আগামীকালও সে একই কাজ করবে। আপনার মত তার অ্যাম্বিশন নেই, বড় কিছু করার ইচ্ছে নেই, দেশ-মানুষের উপকারে আসার খায়েশ নেই। মনে রাখবেন, Your network is your net-worth ৫। আর এইসব পেশায় যে খুব বেশী ইনকাম হয় তাও কিন্তু না। শিরোনামে লেখা ‘চাকরি ছেড়ে লাউ চাষে লাখপতি’। ভিতরে লিখেছে এক বছরে তার আয় তিন লাখ টাকা। মানে ওই লোক মাসে ২৫,০০০ টাকা কামায়, সেটা আবার নিউজ! তাই এইসব ভুয়া মোটিভেশনের ফাঁদে পড়বেন না। প্রতিবছর নিউজ মিডিয়াগুলো নিজেদের স্বার্থেই এরকম নিউজ করে। গত পাঁচ বছরে তো নিউজ কম দেখেন নি, আইফোন হাতে বাদামওয়ালা, ডিএসএলআর হাতে খিচুড়ি বিক্রেতা। প্রশ্ন হলো তারা এখন কোথায়? তারা এখনো কেন সেই রাস্তায় বসছে না আর ওরকম আয় করছে না? তাহলে এগুলো রিলায়েবল পেশা হয় কিভাবে? কোন কাজই ছোট নয়। কিন্তু সব কাজই যে আপনার ফিল্ড, তা-ও নয়। আপনার কাছে খুব ভালো একটা প্লান আছে, কিন্তু পঞ্চাশ হাজার টাকার জন্য আপনি এগোতে পারছেন না। এখন আপনি যদি মাছ কুটে, বাদাম বেঁচে ওই পঞ্চাশ হাজার টাকা জোগাড় করে ফেলতে পারেন, তাহলে সেটা ঠিক আছে। কিন্তু যেভাবে এসব পেশাকে সরাসরি একটা ওয়েল পেইড জবের বিকল্প হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তা মোটেও রিয়েলিস্টিক নয়। একবার মন থেকে উঠে গেলে,সেই মানুষের কোনো স্মৃতিই ডিলিট করার প্রয়োজন হয় না। তার ছবি, তার মেসেজ,তার ফোন নম্বার,তার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট আর যাবতীয় যা যা আছে.. কোনোকিছুই ডিলিট করার প্রয়োজন হয় না, তার হেরে যাওয়া দেখলেও কষ্ট হয় না তার সফলতা দেখলেও আফসোস হয় না। ডিলিট যায়,তার জন্য আলাদা করে কোনোকিছুই ভাবতে হয় না! একবার মন থেকে উঠে গেল মানে চিরতরেই গেল! There’s no coming back! “হে আল্লাহ! দুশ্চিন্তা, পেরেশানি, অক্ষমতা, অলসতা, কৃপণতা, ভীরুতা, মানুষের কাছে ঋণের ভার এবং আমার ওপর মন্দ লোকের প্রভাব বিস্তার থেকে আপনার কাছে আশ্রয় কামনা করছি!” [বুখারি- ৬৩৬৯] সাধারণভাবে আযান থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে দু’আ করতে পারেন নিঃসংকোচে। কারণ ১৫ মিনিট আগে কোথাও ইকামাত শুরু হয় না (মাগরিব বাদে)। এ সময় বেশি বেশি দু’আ করুন। . দুআর শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা করবেন। সেটা হতে পারে সূরা ফাতিহার প্রথম আয়াত বা আয়াতুল কুরসির প্রথম লাইনটি (কিংবা পুরোটা)। . এরপর দুরুদে ইবরাহীম (যেটা নামাযের শেষ বৈঠকে পড়ি) পড়বেন। এরপর নিজের মত করে দু’আ করবেন। . দু’আর মাঝে একটু পর-পর “ইয়া হাইয়ু ইয়া ক্বাইয়ূমু” পড়তে থাকবেন। দু’আ ইউনুসও পড়বেন (লা ইলাহা ইল্লা আনতা… যোয়ালিমিন)। . দু’আ শেষ করবেন আগের মতই– আল্লাহর প্রশংসা, অতপর দুরূদ এরপর “আমীন” বা “ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম” বলে দু’আ শেষ করবেন। অথবা আল্লাহর কোন গুণবাচক নাম দিয়ে । বিঃদ্রঃ উযু করে দু’আ করবেন। অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে দু’আ করবেন। এটাই উত্তম পদ্ধতি। মহান রব সকলের নেক দু’আ সমূহ কবুল করুন। আমিন জাযাকুমুল্লাহ খাইরান। কখনো কখনো তোমার মুখটা বন্ধ রাখতে হবে। গর্বিত মাথাটা নত করতে হবে এবং স্বীকার করে নিতে হবে যে তুমি ভুল। এর অর্থ তুমি পরাজিত নাও, এর অর্থ তুমি পরিণত এবং শেষ বেলায় জয়ের হাসিটা হাসার জন্য ত্যাগ স্বীকারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।.. —–হুমায়ূন আহমেদ | ০১. মাওলানা রুমির নিমন্ত্রণে গুরু শামস তাব্রিজি এলেন এক রাতে। খাওয়াদাওয়া শেষে, রুমির কাছে মদের আবদার করে বসলেন গুরু। রুমি স্তব্ধ! “গুরু, আপনি মদ্যপান করেন?” তাব্রিজির শান্ত জবাব, “হ্যাঁ।” শিষ্য ইতস্তত, যেতে চান না মদ আনতে— “মদ আনতে গেলে তো আমার মানসম্মান সব শেষ হয়ে যাবে! সমাজে আমার একটা সম্মান আছে গুরু।” গুরু পরামর্শ দিলেন— “কোনো সেবককে পাঠাও, নিয়ে আসবে।” রুমি হতভম্ব— “এ কী করে সম্ভব! ওদের কাছে আপনার-আমার মানমর্যাদা যে ধূলোয় মিশে যাবে!” “তাইলে তুমি নিজেই যাও”— নাছোড় নির্বিকার শামস তাব্রিজির আদেশ। ০২. বেরিয়ে পড়লেন ভয়ার্ত, বিব্রত মাওলানা রুমি। লুকিয়েচুরিয়ে হাঁটা ধরলেন মদ্য-পল্লীর দিকে। চারদিকে তাকিয়ে, ঢুকে গেলেন শুঁড়িখানায়। মদ-ভর্তি একটি বোতল কিনে, আলখাল্লার ভিতরে লুকিয়ে, বেরিয়ে এলেন তিনি দ্রুত। জনৈক পরিচিত দেখে ফেললো তাকে, মদ কিনতে। ছড়িয়ে পড়লো খবর। তাকে অনুসরণ করতে লাগলো বিরাট জনতার দল, চুপচাপ, অন্ধকারে। মসজিদের দুয়ারে আসতেই, হাহাকার করে উঠলো অনুসৃত দলের এক রুষ্ট কণ্ঠে, “হায় ইমাম, মদ কিনে আনলেন কোন্ সাহসে আপনি! হায়!” আলখাল্লার নিচ থেকে, লুকোনো মদের বোতল উদ্ধার করলো ক্ষিপ্ত জনতা। শুরু করলো থুতু নিক্ষেপ, হাত তুললো কেউকেউ, সম্মানিত-পাগড়ি টেনে ফেলে দিলো ধূলোয়। রুমির মুখে শব্দ নেই, তিনি অপরাধবোধে ও ভয়ে নির্বাক। ক্ষুব্ধ জনতার ক্রোধ বাড়তে থাকলো, মাওলানাকে হ’ত্যার ইচ্ছে পোষণ করলো কেউকেউ। তখনই মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলেন গুরু শামস তাব্রিজি। ক্ষুব্ধ স্বরে ধিক্কার জানালেন উন্মত্ত জনতাকে— “ধিক্ তোমাদের! ধিক্! তোমরা কোন্ বিবেকে ভেবে নিলে যে, মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির মতো মানুষ মদ্যপান করেন? এ-ই তোমাদের বিবেচনা? খোকো ওই বোতল, ওটায় আছে সিরকা, রান্নার জন্য। খোলো।” বোতলটি খোলা হলো। ওটা সিরকায় ভর্তি। রুমি নিজেই অবাক! মারমুখী জনতা স্তম্ভিত, লজ্জিত, অনুতপ্ত। নিজেদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিলো তারা। ০৩. মসজিদে প্রবেশ করলেন গুরু-শিষ্য। শামস তাব্রিজি জানালেন শিষ্যকে— “আসার সময় শুঁড়িওয়ালাকে বলে রেখেছিলাম, তুমি এলে সে যেন তোমাকে সিরকা-ভর্তি বোতল দেয়।” মাওলানা রুমি অভিমান করলেন— “কেন আমার সম্মান নিয়ে এমন ক্রীড়া করলেন আপনি?” উত্তর দিলেন শামস— “যাতে তুমি এ শিখতে পারো যে: মানুষের দেওয়া সম্মান মূলত একধরণের মোহ। সামান্য একটু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে যারা তোমাকে চরম অপমান করলো, প্রায় মেরেই ফেলেছিলো, তারা তো তোমাকে কখনো সম্মানই করেনি। মানুষের এই সম্মান নিয়েই তুমি গর্ব করতে? মাওলানা, সৃষ্টির কাছ থেকে সম্মান খোঁজা বন্ধ করো; সম্মানপ্রাপ্তির চেষ্টা করো স্রষ্টার কাছ থেকে, অনুগত হও কেবল স্রষ্টার কাছে, যাঁর বিবেচনা মোহের মতো যখনতখন পরিবর্তিত হয় না। মানুষ সম্মান করে নিজ স্বার্থে; সম্মানকে অপমানে পরিবর্তন করতেও দু’বার ভাবে না, তাও নিজ স্বার্থেই।” ভাষান্তরঃ Salah Uddin Ahmed Jewel এপস্টিন নয়, টিম কে মনে রাখুন -সেজান মাহমুদ ======================= তিনি ১৯৮৯ সালে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব আবিষ্কার করেছিলেন—এবং চাইলে বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটি বিনামূল্যে মানবজাতির হাতে তুলে দেন। ১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে, সুইজারল্যান্ডের ইউরোপীয় পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র CERN-এ কর্মরত ৩৩ বছর বয়সী এক সফটওয়্যার প্রকৌশলী, টিম বার্নার্স-লি, তাঁর বসের কাছে একটি প্রস্তাব জমা দেন। সেই প্রস্তাবে তিনি এক বিপ্লবী ধারণার কথা বলেন: এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে থাকা বিজ্ঞানীরা ভিন্ন ভিন্ন কম্পিউটার ব্যবহার করেও একে অপরের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবেন—শুধু পরস্পর সংযুক্ত লিঙ্কে ক্লিক করে। তার বস প্রস্তাবের ওপর লিখেছিলেন: “অস্পষ্ট, কিন্তু উত্তেজনাপূর্ণ।” তারপর সেটি ফাইলবন্দি করে রেখে দেন—আর কিছুই করেন না। টিম একটি গভীর সমস্যাকে চিহ্নিত করেছিলেন, যা CERN-এর গবেষকদের প্রায় উন্মাদ করে তুলছিল। বহু দেশ থেকে আসা হাজার হাজার বিজ্ঞানী পার্টিকল ফিজিক্স নিয়ে কাজ করছিলেন এবং বিপুল পরিমাণ তথ্য তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু প্রতিটি গবেষণা দল ব্যবহার করত আলাদা কম্পিউটার সিস্টেম, আলাদা সফটওয়্যার, আলাদা ফরম্যাট। কোনো সহকর্মীর কম্পিউটার থেকে তথ্য পেতে হলে আগে জানতে হতো তিনি কোন সিস্টেম ব্যবহার করছেন, তার নির্দিষ্ট কমান্ড শিখতে হতো, আর প্রায়ই সরাসরি তার অফিসে গিয়ে হাজির হতে হতো। জ্ঞান বিনিময়—যা বৈজ্ঞানিক গবেষণার মূল উদ্দেশ্য—অবিশ্বাস্য রকম জটিল হয়ে উঠেছিল। টিম বুঝেছিলেন এমন এক সত্য, যা অন্যরা বুঝতে পারেননি: সমাধান ছিল না আরও ভালো কম্পিউটার বা আরও দ্রুত নেটওয়ার্কে। সমাধান ছিল তথ্যকে সংগঠিত ও সংযুক্ত করার একটি উন্নত পদ্ধতিতে। তিনি কল্পনা করেছিলেন এক ধরনের “ওয়েব”—পরস্পর সংযুক্ত নথির একটি জাল, যেখানে একটি তথ্য থেকে আরেকটিতে যাওয়া যাবে শুধু লিঙ্কে ক্লিক করেই। তথ্য আর আলাদা আলাদা খোপে বন্দি থাকবে না; বরং সবার জন্য উন্মুক্ত এক বিশাল, আন্তঃসংযুক্ত নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে উঠবে। আজ এটি স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু ১৯৮৯ সালে এটি ছিল একেবারেই বিপ্লবী চিন্তা। তবু কেউ এতে অর্থায়ন করতে চায়নি। তার বস বিষয়টিকে আকর্ষণীয় মনে করলেও অগ্রাধিকার দেননি। CERN-এর কাজ ছিল পার্টিকল ফিজিক্স—তথ্য ব্যবস্থাপনা নয়। টিম যদি নিজের “ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব” বানাতে চান, তবে সেটি তাঁকে অবসর সময়েই করতে হবে। তাই তিনি সেটাই করলেন। নিজের ছোট অফিসে একটি NeXT কম্পিউটারে রাত ও সপ্তাহান্তে কাজ করে টিম কোড লেখা শুরু করলেন। তাঁকে এমন অনেক কিছুই আবিষ্কার করতে হলো, যেগুলোর তখনো অস্তিত্ব ছিল না— • HTML (হাইপারটেক্সট মার্কআপ ল্যাঙ্গুয়েজ) — লিঙ্কসহ নথি সাজানোর একটি ভাষা • HTTP (হাইপারটেক্সট ট্রান্সফার প্রোটোকল) — নেটওয়ার্কে সেই নথি আদান-প্রদানের পদ্ধতি • URL (ইউনিফর্ম রিসোর্স লোকেটর) — নির্দিষ্ট নথির ঠিকানা • প্রথম ওয়েব ব্রাউজার — নথি দেখা ও নেভিগেশনের সফটওয়্যার • প্রথম ওয়েব সার্ভার — নথি সংরক্ষণ ও শেয়ারের ব্যবস্থা মূলত তিনি একাই আধুনিক ইন্টারনেটের সম্পূর্ণ অবকাঠামো তৈরি করছিলেন। ১৯৯০ সালের শেষ নাগাদ টিমের কাছে একটি কার্যকর প্রোটোটাইপ ছিল। তিনি লেখা ও লিঙ্কসহ পৃষ্ঠা তৈরি করতে পারতেন, সেগুলো সার্ভারে রাখতে পারতেন, আর নিজের ব্রাউজারে দেখতে পারতেন। তিনি এটি CERN-এর সহকর্মীদের দেখান। কেউ কেউ আগ্রহী হন, কিন্তু অধিকাংশই এর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারেননি। ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট, টিম বার্নার্স-লি প্রথম ওয়েবসাইটটি একটি পাবলিক নেটওয়ার্কে প্রকাশ করেন। সেটি ছিল একটি সাধারণ পৃষ্ঠা, যেখানে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব কী এবং কীভাবে ব্যবহার করতে হয়—তা ব্যাখ্যা করা ছিল। কেউই লক্ষ্য করেনি। মাসের পর মাস তার এই সৃষ্টি প্রায় অব্যবহৃতই থেকে যায়। তিনি ইন্টারনেট ফোরাম ও বুলেটিন বোর্ডে গিয়ে ভদ্রভাবে মানুষকে এই নতুন “ওয়েব” ব্যবহার করে দেখতে বলতেন। বেশিরভাগই তাঁকে উপেক্ষা করত। তারপর ধীরে ধীরে কিছু কম্পিউটার বিজ্ঞানী—অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানে—এটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। তারা নিজেদের ওয়েব সার্ভার বানান, নিজেদের পৃষ্ঠা তৈরি করেন। ১৯৯৩ সালে পৃথিবীতে প্রায় ৬০০টি ওয়েবসাইট ছিল। তখনই সবকিছু বদলে যায়। ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মার্ক অ্যান্ড্রিসেন তৈরি করেন মোজাইক—একটি গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেস-সমৃদ্ধ ওয়েব ব্রাউজার, যা অপ্রযুক্তিগত ব্যবহারকারীদের জন্যও ওয়েবকে সহজ করে তোলে। হঠাৎ করেই যে কেউ টিমের আবিষ্কার ব্যবহার করতে পারল। ওয়েবসাইটের সংখ্যা হাজারে, তারপর লক্ষে পৌঁছে যায়। ১৯৯৪ সালের মধ্যে ব্যবসায়ীরা বুঝে যান—এই “ওয়েব” জিনিসটি বাণিজ্য, যোগাযোগ, সবকিছুই বদলে দিতে পারে। কোম্পানিগুলো ওয়েব উপস্থিতি গড়তে প্রতিযোগিতায় নামে। বিনিয়োগকারীরা ইন্টারনেট স্টার্টআপে অর্থ ঢালতে শুরু করেন। আর ঠিক তখনই টিম বার্নার্স-লি এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন, যা মানব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। CERN তাঁর কাছে জানতে চায়: ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব প্রযুক্তিগুলো কি পেটেন্ট করা উচিত? টিম চাইলে “হ্যাঁ” বলতে পারতেন। যদি তিনি ও CERN HTML, HTTP ও URL—ওয়েবের মৌলিক ভিত্তিগুলো—পেটেন্ট করতেন, তবে প্রতিটি ওয়েবসাইট, প্রতিটি ব্রাউজার, প্রতিটি ইন্টারনেট কোম্পানির কাছ থেকে লাইসেন্স ফি নেওয়া যেত। একবার ভাবুন। ইতিহাসে যত ওয়েবসাইট হয়েছে—সবকটিই টিম বার্নার্স-লিকে টাকা দিত। গুগল, অ্যামাজন, ফেসবুক, প্রতিটি স্ট্রিমিং সেবা, প্রতিটি অনলাইন ব্যাংক, প্রতিটি ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম—সবই তাঁর উদ্ভাবিত প্রযুক্তির ওপর দাঁড়ানো। তিনি অকল্পনীয় ধনী হতে পারতেন—গেটসের চেয়েও, বেজোসের চেয়েও, মানব ইতিহাসের যেকোনো মানুষের চেয়েও ধনী। কিন্তু ১৯৯৩ সালের এপ্রিল মাসে CERN ঘোষণা করে: ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব চিরদিনের জন্য সবার ব্যবহারের জন্য মুক্ত থাকবে। কোনো পেটেন্ট নেই। কোনো লাইসেন্স ফি নেই। কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। টিম বার্নার্স-লি বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে মূল্যবান আবিষ্কারটি বিনামূল্যে দিয়ে দিলেন। কেন? সাক্ষাৎকারে তিনি সবসময়ই স্পষ্ট ছিলেন: “এটি সবার জন্য।” তিনি বিশ্বাস করতেন—জ্ঞান সবার কাছে পৌঁছানো উচিত। তিনি বিশ্বাস করতেন—ওয়েব তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারে কেবল তখনই, যখন এটি উন্মুক্ত ও মুক্ত থাকবে। তিনি জানতেন—অর্থের দেয়াল, সীমাবদ্ধতা বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে ওয়েবের আসল শক্তিটাই নষ্ট হয়ে যাবে। তাই তিনি সেটি ছেড়ে দিলেন। ইন্টারনেট বুম হলো—কিন্তু তিনি ধনী হলেন না। ডট-কম যুগের কোটিপতি ও বিলিয়নিয়াররা সেই অবকাঠামোর ওপরই নিজেদের সাম্রাজ্য গড়লেন, যা টিম তৈরি করে বিনামূল্যে দিয়ে দিয়েছিলেন। জেফ বেজোস ওয়েবের ওপর অ্যামাজন গড়লেন। ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন গুগল তৈরি করলেন। মার্ক জাকারবার্গ ফেসবুক বানালেন। তাঁরা সবাই বিলিয়নিয়ার হলেন—টিমের আবিষ্কৃত ও পেটেন্ট না করা প্রযুক্তি ব্যবহার করে। আর টিম বার্নার্স-লি? তিনি একজন অধ্যাপক হলেন। তিনি World Wide Web Consortium (W3C) প্রতিষ্ঠা করলেন—ওয়েব মানদণ্ড রক্ষার জন্য। রানী এলিজাবেথ দ্বিতীয় তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মানসূচক ডিগ্রি পান। কিন্তু নিজের আবিষ্কার থেকে কখনো ধনী হননি। আজ, ৩০ বছরেরও বেশি সময় পরে, পৃথিবীতে ১.৯ বিলিয়নের বেশি ওয়েবসাইট রয়েছে। বৈশ্বিক ইন্টারনেট অর্থনীতির মূল্য ট্রিলিয়ন ডলার। সম্পূর্ণ কিছু শিল্প কেবলমাত্র ওয়েবের কারণেই অস্তিত্বশীল—যেটি টিম আবিষ্কার করেছিলেন এবং তারপর বিনামূল্যে দিয়ে দিয়েছিলেন। আর টিম? গত তিন দশক ধরে তিনি ওয়েবকে উন্মুক্ত ও মুক্ত রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ইন্টারনেটে সরকারি সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। ওয়েব নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া একচেটিয়া প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরোধিতা করেছেন। উন্নয়নশীল দেশে ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। নেট নিউট্রালিটির হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। ২০১৯ সালে তিনি চালু করেন “Contract for the Web”—একটি নীতিমালা, যেখানে সরকার ও কোম্পানিগুলোকে আহ্বান জানানো হয় ইন্টারনেটকে উন্মুক্ত, নিরাপদ ও অপব্যবহারমুক্ত রাখতে। কারণ টিম যে বিষয়টি বোঝেন—আর অনেক ইন্টারনেট বিলিয়নিয়ার যা ভুলে যান—তা হলো: ওয়েবের শক্তি আসে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকার মধ্য থেকেই। যখন মানুষ তাঁকে জিজ্ঞেস করে—তিনি কি নিজের আবিষ্কার পেটেন্ট না করার জন্য আফসোস করেন? টিমের উত্তর খুবই সহজ: “আমি যদি পেটেন্ট করতাম, তাহলে এটি ওয়েব হতো না।” তিনি ঠিকই বলেছেন। যদি ওয়েব ব্যবহার করতে লাইসেন্স ফি দিতে হতো, যদি ওয়েবসাইট বানাতে অনুমতি লাগত, যদি ইন্টারনেটের মৌলিক প্রোটোকল কোনো কর্পোরেশনের মালিকানায় থাকত—তাহলে আধুনিক ডিজিটাল বিশ্বের এই বিস্ফোরক বিকাশ কখনোই হতো না। ওয়েব সফল হয়েছে—কারণ টিম সেটি দিয়ে দিয়েছিলেন। ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের একটি ছবি আছে। সেখানে টিম বসে আছেন একটি NeXT কম্পিউটারের সামনে—যে মডেলটি ব্যবহার করে তিনি ওয়েব আবিষ্কার করেছিলেন। আর স্টেডিয়ামের ওপরে আলোর অক্ষরে ভেসে উঠছে একটি বার্তা: “This is for everyone.” (এটি সবার জন্য।) এটাই তাঁর উত্তরাধিকার। কোটি কোটি ডলার নয়। কোনো কর্পোরেট সাম্রাজ্য নয়। শুধু এই চারটি শব্দ। তিনি এমন কিছু আবিষ্কার করেছিলেন, যা মানব সভ্যতাকে বদলে দিয়েছে। তিনি চাইলে সেটির মালিক হতে পারতেন, নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন, অসম্ভব ধনী হতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটি আমাদের সবার জন্য দিয়ে দিয়েছেন। ১৯৮৯ সালে তাঁর ছিল তথ্য সংযোগের একটি ধারণা। ১৯৯৩ সালে তাঁর সামনে ছিল একটি সিদ্ধান্ত—কে সেই ধারণার সুফল পাবে। তিনি বেছে নিয়েছিলেন সবাইকে। আর সেই কারণেই আপনি আজ এটি পড়তে পারছেন। Uncategorized Thoughts বাংলা